শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৭

ভূত কি বাস্তবতা, নাকি রহস্যময় মস্তিষ্কের প্রতারণা?

ভূত কি বাস্তবতা, নাকি রহস্যময় মস্তিষ্কের প্রতারণা?
ভুতের প্রতীকী ছবে
আপনি যদি অশরীরী আত্মায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি এক নয়। পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতি এবং ধর্মের মানুষ আত্মার উপস্থিতিতে বিশ্বাস রাখে, যা কিনা কারো মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকে। আমারা অপচ্ছায়ায় এতটাই বিশ্বাস রাখি যে আমাদের আশেপাশে আজব কিছু হলেই ভূতকে দায়ী করি। কোন ভীতিজনক ঘটনা যার ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই, সেটা অবশ্যই ভূতই করেছে বলে ধরে নেই! সার্ভে অনুযায়ী আমেরিকার ২২% মানুষ বলে যে, তারা জীবনের কোন না কোন সময় ভূত দেখেছে (CBSnews Poll)। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, উন্নত বিশ্বে প্রায় ৪৪% মানুষ ভূত না দেখলেও ভূত আছে বলে বিশ্বাস করে (CBSnews Poll)। অনুন্নত আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর পরিমান আরও বেশী, প্রায় ৬০% থেকে ৮০%। কিন্তু এর মানে কি আসলেই ভূত বিদ্যমান? আসুন বরং সেটাই জানার চেষ্টা করি। 

যারা মৃত্যু পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করে তাদের কাছে ভূতের উপস্থিতি বিশ্বাস করা সাধারন ব্যাপার। কিন্তু কিছু বিজ্ঞানমনস্ক লোক আছে যারা ভূতকে অস্বীকার করে না। তাদের ধারনাটি মূলত “First Law of Thermodynamics” এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। “First Law of Thermodynamics” এর মতে এনার্জি কখনও বৃদ্ধি বা হ্রাস পায় না। একে ধ্বংস করা যায় না। এনার্জি অপরিবর্তনীয়। এটা শুধু এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তিত হয় মাত্র। যেমন- অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন মিলে পানি হয়; পানি তাপ পেয়ে বাষ্পে পরিনত হয়; বাষ্প বা মেঘ বজ্র/বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে; এরপর বৃষ্টির মাধ্যমে আবার পানিতে পরিনত হয়। “First Law of Thermodynamics” এর উপর ভিত্তি করে তারা বলে যে, আমরা যদি মারা যাই তবে আমাদের একধরনে এনার্জি অথবা আমরা তাকে আত্মাও বলতে পারি, জীবিত থাকবে আমাদের মৃত্যুর পরও। এটা শুনে কিছুটা যুক্তিযুক্ত মনে হলেও এর বিরোধকারীরাও আছে। বিরোধকারী দলটি বলে যে, আমাদের এনার্জি কখনোই অশরীরী আত্মাতে নয় বরং এটা আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতিতে স্থানান্তর হয়। মাইক্রো-অর্গানিজম প্লান্ট আর বিভিন্ন প্রানী এই এনার্জিকে Absorb করে। 


ভূত ধারনাটির আরও অনেক অসংগতি আছে যেগুলো বিজ্ঞান সমর্থন করে না। যেমন, ভূত দেয়াল বা অন্যকিছু ভেদ করে চলে যেতে পারে আবার তারা দেয়াল বা অন্য কিছু ভাংগেও পারে। তারা মানুষকে ভেদ করে যেতে পারে, সাথে সাথেই আবার মানুষকে আঘাতও করতে পারে? বেশ অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাপারটি। Paranormal Investigators যাদেরকে আমরা বলি “Ghost Hunters” তারা সাধারন ভূতের উপস্থিতি বোঝার জন্য ঐ জায়গার তাপমাত্রা মেপে থাকেন। কারন ধারনা করা হয় যেখানে ভূত থাকে সেই স্থানের তাপমাত্রা আশেপাশের এলাকার তাপমাত্রা থেকে ঠান্ডা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, যদি ভূত এনার্জি হয় তবে ঐ স্থানে তাপমাত্রা কমে কিভাবে? সেখানের তাপমাত্রা তো বেড়ে যাওয়ার কথা। ভূতকে যদি আমরা পদার্থ বলে ধরে নেই তবেই কেবল তাপমাত্রা কমানো সম্ভব কারন তখন ভূত ঐ রুমের তাপমাত্রা Absorb করে রুমটা ঠান্ডা করতে পারবে। আবার ভূত যদি পদার্থ হয়ে তবে তাদের আমরা দেখবো এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভূত যদি দেখাই যায় তবে সেটা অশরীরী আত্মা হয় কিভাবে?

তাহলে বিজ্ঞান কি ভূত দেখাকে অস্বীকার করে? উত্তরটা মজাদার। বিজ্ঞান ভূতকে অস্বীকার করে কিন্তু ভূত দেখাকে অস্বীকার করে না। হ্যাঁ, আমরা ভূতকে দেখতে পাই। তবে এই ভূত সেই ভূত নয় যেটার সংজ্ঞা আমরা আমাদের কুসংস্কার থেকে পাই। প্রায় সময়ই আমারা ভূত দেখতে পাই আজগুবি কতগুলো ফটোর মধ্যে কিংবা ইউটিউবের আজব কিছু ভিডিওতে যেখানে অস্বাভাবিক কিছু একটা হচ্ছে অথবা কারও কাছ থেকে শুনে যে কিনা ভূত দেখেছিল। ব্যাপারগুলো দেখতে আর শুনতে বেশ চমকপ্রদ লাগে। কিন্তু এগুলোর কোনভাবেই বিজ্ঞানসম্মত প্রমান নয়। 

ভূতের থাকা না থাকার ব্যাপারে যেহেতু কোন বিজ্ঞানসম্মত প্রমান নেই, তাই বলে ভূত দেখলেই যে সে মানসিকভাবে অসুস্থ হবে, এটা ঠিক নয়। ভূত দেখার অনেক যুক্তিযুক্ত কারন আছে। তার মধ্যে একটি কারন হলো Infrasound। আমারা স্কুল জীবনে পড়েছি যে বাতাসে তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দ সৃষ্টি হয়। Infrasound হচ্ছে ঐ শব্দতরঙ্গ যেটা এতটাই ছোট হয় যে সেই শব্দ আমরা শুনতে পারি না, কিন্তু তরঙ্গটি আমাদের সাথে interact করতে পারে। এই শব্দতরঙ্গটি সাধারনত সৃষ্টি হয় খারাপ আবহাওয়া, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি যেমন ইঞ্জিন, বৈদ্যুতিক পাখা ইত্যাদির কারনে। সাধারনত যে শব্দের তরঙ্গ ২০ হার্জের বেশি হয় শুধুমাত্র সেই শব্দ আমরা শুনতে পারি। কিন্তু Infrasound এর ফ্রিকোয়েন্সি ১৮.৯৮ হার্জ, তাই এই শব্দ আমরা শুনতে পাই না। যেহেতু Infrasound এর তরঙ্গ ছোট হয় তাই এটা আমাদের চোখের স্টাকচারের সাথে interact করে। আর এই interaction ঐ ফ্রিকোয়েন্সিতে চোখে সূক্ষ্ম কম্পন সৃষ্টি করে। একে বলা হয় অনুরণন। এই অনুরণন বা Resonance খুব সহজেই আমাদের অগচরে আমাদের দৃষ্টিগোচর সবকিছু প্রভাবিত করে। এধরনে ঘটনা যদি কারো সাথে ঘটে আর সে যদি আগে থেকে ভূত বিশ্বাস করে তবে স্বাভাবিকভাবেই সে চমকিয়ে যাবে। তবে এই চমকিয়ে যাওয়াটা একটু অন্যরকম হয়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন Hypervigilance হওয়া। এই Hypervigilance অবস্থায় আমাদের সকল ইন্দ্রিয় Hyperactive হয়ে যায়। এই সময় অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো আমারা পর্যবেক্ষণ করতে পারি যা স্বাভাবিক সময় করা সম্ভব নয়। এতে আমরা আরো ঘাবড়ে যাই। কারন তখন আমাদের কাছে সবকিছুই ভুল আর ভয়ংকর মনে হয়। 

স্লিপ প্যারালাইসিস
স্লিপ প্যারালাইসিসের প্রতীকী ছবি
কিন্তু এটাই শেষ নয়। কিছু মানুষ আসলেই ভূত দেখেছেন এবং অনুভব করেছেন। এই অবস্থায় তারা মনে করে যে তারা জেগে আছে কিন্তু আসলে তারা স্বপ্ন দেখছে। এই বিশেষ অবস্থাটা হচ্ছে Sleep Paralysis। সার্ভে করে জানা যায় যে, প্রায় ১০% মানুষ জীবনের কোন না কোন সময় এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। আমি নিজেও এর সম্মুখীন হয়েছি। Sleep Paralysis -এ স্বপ্নে ভয়ংকর কিছু একটা দেখে, কিন্তু যখন সে শরীর নাড়াতে চায় বা পালাতে চায় যে পারে না। তার সারা শরীর অসার হয়ে পড়ে থাকে। এটা ঘটে কারন ঘুমানোর সময় নার্ভাস সিষ্টেম আমাদের শরীরকে প্যারালাইসিস করে দেয় যাতে আমরা ঘুমাতে ঘুমাতে কোথাও চলে না যাই। আজব না? এই ব্যাপারগুলো যারা জানে না তারা তো বলবেই যে, ভূত তাদের জড়িয়ে ধরে ছিল তাই সে নড়তে পারেনি। 


কোন প্রকার বড় দুঃখ পাওয়ার সাথেও ভূত দেখার সর্ম্পক থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভূত দেখেছে এমন মানুষের মধ্যে ৩২% বলেছে যে, তারা যাকে হারিয়েছে তাকে তারা দেখতে পেয়েছে এবং কথাও বলেছে। এটা একধরনে Hallucination যা তাদের ব্রেনে কিছু অংশ তৈরি করেছিল। এক গবেষনায় বিশেষভাবে তৈরিকৃত যন্ত্র দ্বারা ব্রেনের একটি অংশ যাকে বলা হয় Angular Gyrus একটিভ করে, ফলে রোগী একধরনে অপচ্ছায়া দেখতে পায়। আর ঐ অপচ্ছায়াকে নিয়ন্ত্রন করা হচ্ছিল ইলেক্ট্রিক কারেন্সের মাধ্যমে। এভাবে বহু গবেষনা করা হয়েছে যেখানে ব্রেনের এইটি বিশেষ অংশ ট্রিগার করে ভূত, পরী এমনকি ইশ্বরের দেখা মেলে। যদিও বাস্তবে কিছুই ছিল না, সবই ছিল Hallucination। 

এছাড়া তথাকথিত কিছু ভূতের বাড়ীতে যেখানে মানুষ অশরীরী কিছু অনুভব করেছে সেখানে এমন কিছু Fungus আর Molds পাওয়া গেছে যেমন- Ergot যেটা থেকে Lytsergic Acid উৎপন্ন হয়। এই Lytsergic Acid থেকে ভয়ংকর ড্রাগ LSD তৈরি করা হয়। আর আমরা জানি এই LSD ড্রাগ আমাদের ব্রেনকে কিভাবে Hallucinate করে। অর্থাৎ ভূতের বাড়ীতে ভূত না থাকলেও Lytsergic Acid এর প্রভাবে আমরা আজগুবি সবকিছু দেখতে পাই। 

তাহলে আসলেই কি ভূত নেই। ভূত না থাকার ব্যাপারে বিজ্ঞান কিছু যুক্তি দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা আছে যেগুলো বিজ্ঞানের কাছে এখনো ব্যাখ্যাতীত। সামনের লেখায় চেষ্টা করবো সেগুলো তুলে ধরার। লেখাটা অনেক বড়। ধৈর্য্য ধরে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। লেখাটিতে যদি কোন ভুল থাকে আমাদের জানাবেন। ভাল থাকবেন। আল্লাহ্ হাফেজ!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only

Start typing and press Enter to search