শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

আশ্চর্যময় প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার কথা

আশ্চর্যময় প্রাচীন মিশরের কথা
পিরামিড
আমরা সবাই এটা জানি যে, মিশরীয় সভ্যতা মূলত তাদের মমি, ফারাও রাজা আর পিরামিডের স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিখ্যাত। মিশরের কথা মনে হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল বিশাল পিরামিডের চিত্র। কিন্তু শুনে আশ্চার্য হবেন যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিড মিশরে অবস্থিত নয় এবং তেমনি সবচেয়ে বেশি পিরামিড আছে মিশরে, এটা মনে করলে বলবো আপনার জানা তথ্যে ভুল আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিড অবস্থিত মেক্সিকোতে, যার নাম “The Great Pyramid of Cholula”। পিরামিডটি “Tlachihualtepetl” নামেও বেশ পরিচিত। আর সবচেয়ে বেশি পিরামিড আছে সুদান নামীয় একটি দেশে। সুদানে মিশরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন পিরামিড আছে। মিশরের সবচেয়ে বড় পিরামিড “Pyramid of Khufu”। আজ আমরা প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার এমনই কিছু তথ্য উপস্থাপন করবো যা সম্ভবত আপনাদের অনেকেরই অজানা।

প্রাচীন মিশরের মানুষ মৃত্যুর পরবর্তী জীবন নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতেন। তারা বিশ্বাস করতেন মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ অংশ নয় বরং জীবনের একটি পর্যায় মাত্র, যার পরে জীবনের আর এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। আর এই জন্যই যখন তাদের মৃত্যু হতো তখন তাদের মমির সাথে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি পিরামিডে রেখে আসা হতো। কিন্তু মিশরের সব মানুষের মমি তৈরি করা হতো না। শুধুমাত্র মিশরের ফারাও রাজা, রাজ পরিবারের সদস্য এবং ধনী ব্যক্তিদের মমি তৈরি করা হতো। মিশরের মানুষ বিশ্বাস করতো যে, পুনর্জন্ম সম্ভব তবে সে জন্য শরীরের একটি বিশেষ অবস্থার প্রয়োজন। এজন্য তারা মৃত ব্যক্তিকে দাফন বা পোড়ানোর বদলে মমি বানাতো। মমি বানানোর জন্য প্রথমে শরীরের ভিতরকার সকল নাড়ি-ভুরি ও অন্যান্য অংগ বের করা হতো এবং তার মগজ নাক দিয়ে বের করা হতো। কিন্তু কখনও তার হৃদপিন্ড বের করা হতো না, কারন তারা হৃদপিন্ডকে আত্মার প্রতীক মনে করতেন। শরীরের ভেতর থেকে বের করা অংগগুলোকে মমির সাথে আলাদা-আলাদা পাত্রে রেখে দেওয়া হতো। রাজার মমির সাথে নির্দয়ভাবে চাকর-চাকরানীদেরকেও জীবিত দাফন করা হতো। প্রথমে তাদের মাথায় আঘাত করে সংজ্ঞাহীন করা হতো, তারপর মমির সাথে তাদেরকেও কফিনে রেখে দেওয়া হতো। 


মিশরের ফারাও রাজারা মোটা ও স্থুলকার হতো। যদিও মিশরের প্রাচীন চিত্রতে ফারাও রাজাদের চিকন ও সুঠাম দেহের অধিকারী হিসেবে অংকিত করা হয়েছে; তবে মমি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, ফারাওদের কোমর খুব চওড়া ছিল, এবং মদ, বিয়ার জাতীয় পানীয়, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, ব্রেড ইত্যাদি খাদ্য উপাদান তাদের পাকস্থলিতে পাওয়া যায়। অন্যান্য পরীক্ষাতেও প্রমাণিত হয়েছে তারা স্থুলকার ছিল।

আশ্চর্যময় প্রাচীন মিশরের কথা
মিশরীয় দেব-দেবী
প্রাচীন মিশরে প্রায় ২০০০ এর বেশি দেব-দেবীর পূজা করা হতো। তারা বিশ্বাস করতো প্রত্যেকটি দেবতা মানুষের জীবনের কোন না কোন অংশের সাথে সম্পর্কিত। যেমন- ন্যায়ের দেবতা, ভালোবাসার দেবতা, স্বাস্থের দেবতা, যাদুর দেবতা ইত্যাদি। মৃত্যু দেবতাকে তারা আনুবিস নামে ডাকতো, আমুন নামের দেবতাকে তার দেবতাদের দেবতা বলে জানতো। তারা রাক্ষস আর ভূত-প্রেতে খুব বেশি বিশ্বাস করতো। তাদের ধারনা অনুযায়ী রাক্ষস আর ভূত-প্রেত মানুষের চেয়ে শক্তিশালী কিন্তু তারা দেবতাদের চেয়ে কম শক্তিশালী। এজন্য তারা দেবতাদের উপর খুব আস্থাশীল ছিল। মিশরে প্রায় ৩০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পৌরানিক ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত ছিল। ৪০০ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে অধিকাংশ মিশরীয়রা খ্রিষ্টান ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে যায়। কারন ঐ সময় মিশর রোমান ও গ্রীক রাজ্যত্বের অংশ ছিল। পরবর্তীতে দশম শতকের মাঝামাঝি সময়ে আরবীয়দের কর্তৃক মিশর জয় লাভ করার পরে সেখানে ব্যাপকহারে লোকজন ধর্মত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। মিশরের বহু পুরাতন কপটিক ভাষার স্থান আস্তে আস্তে আরবী ভাষা দখল করে নেয়। এখন মিশরের দাপ্তরিক ভাষা আরবী। কপটিক ভাষা একটি বিলুপ্ত ভাষা। প্রাচীন মিশরীয়দের ধর্ম বিশ্বাস খুবই চমকপ্রদ। সেগুলো বর্ণনা করতে গেলে একটা বড়সর রচনা লিখতে হবে। ভবিষ্যতে মিশরীয়দের ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে একটি আলাদা প্রবন্ধ লিখবো ইনশাল্লাহ্। আপাতত সংক্ষেপেই শেষ করি। 

মিশরীয়রা বিজ্ঞান ও গাণিতিক বিদ্যায় যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন। তারা বিভিন্ন মেডিসিন ও কসমেটিকস্ তৈরি করেছিল, তাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা ছিল, তাদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র ছিল এবং তারা অনেক বিশাল আকৃতির জাহাজ তৈরি করতে জানতো যার নির্দশন এখনও খুজে পাওয়া যায়। তারা এমন কিছু বিষয় আবিষ্কার করেছিল যা কিনা আমরা এখনও ব্যবহার করি। যেমন- টুথপেষ্ট, কলম, কালো কালি, কাস্তে, সেচব্যবস্থা, বিভিন্ন অস্ত্রোপচার যন্ত্র, পরচুলা, তালা-চাবি ইত্যাদি। 

মিশরীয় সভ্যতার ডাক্তাররা শুধুমাত্র একটি অঙ্গের চিকিৎসা করতেন। ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস বলেন যে, প্রাচীন মিশরের একজন ডাক্তার শুধুমাত্র একটি মাত্র রোগের চিকিৎসা করতেন এবং ঐ রোগ সংক্রান্ত অন্যান্য চিকিৎসা করতেন। তাদের কাছে প্রত্যেক রোগের জন্য আলাদা ডাক্তার থাকতো। 

প্রাচীন মিশরের নারীরা স্বাধীন ছিল। ঐ সময় সারা পৃথিবীতে নারীদের পুরুষের তুলনা নগন্য মনে করা হতো। কিন্তু মিশরের নারীদেরকে পুরুষেদের সমান অধিকার দেওয়া হয়েছিল। মিশরের নারীরা জমি কিনতে পারতো, বিচারক হতে পারতো এবং নিজেদের উইল লিখতে পারতো, যা কিনা ঐসময় নারীদের জন্য কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। যদি নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করতো তবে তারা পুরুষের সমান পারিশ্রমিক পেতেন। তারা তাদের স্বামীকে তালাক দেওয়ার অধিকার রাখতেন এবং আবার অন্য কাওকে নিজের ইচ্ছামত বিয়ে করার স্বাধীনতা পেতেন। এমনকি মিশরের ইতিহাসে বেশ কয়েকজন নারী শাসক ছিলেন যারা কিনা প্রাচীন মিশরের সুবিশাল রাজ্য সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করেছেন। 

প্রাচীন মিশরের বাসিন্দারা চুলকে একদমই পছন্দ করতো না। তারা মনে করতো শরীরে চুল থাকা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এজন্য তারা শরীর থেকে যাবতীয় চুল পরিষ্কার করে ফেলতো। প্রাচীন চিত্রগুলোতে মিশরীয়দের মাথার উপর যে চুল দেখা যায় তা আসল চুল নয়, সেটা হচ্ছে পরচুলা। প্রাচীন চিত্রাংকনগুলো ভালভাবে লক্ষ করলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। তারা পরচুলা টুপির মত করে পরিধান করতো শুধুমাত্র এই কারনে যে, সূর্য্যের আলো যাতে সরাসরি তাদের মাথায় না পরে। প্রাচীন মিশরে মেকআপের বেশ প্রচলন ছিল। যেখানে বর্তমান যুগে শুধু মহিলারাই মেকআপ ব্যবহার করে সেখানে প্রাচীন যুগে মিশরের পুরুষরাও মেকআপ ব্যবহার করতো। তারা চোখে সবসময় অবশ্যই সুরমা লাগতো, কারন তারা ভাবতো যে সবুজ আর কালো সুরমা সূর্য্যের রশ্মি, বিভিন্ন পোকা-মাকড় ও রোগ-জীবানু থেকে তাদের চোখকে রক্ষা করবে। তারা শুধু সৌন্দর্য্যের কারনে নয় বরং ধর্মীয় কারনেও মেকআপ করতো। মিশরীয়দের কাছে মুখ পরিষ্কার রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের কাছে দাঁত পরিষ্কার রাখা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তারা মমির সাথে অবশ্যই টুথপেষ্ট রেখে দিত। মিশরীয়দের টুথপেষ্ট অবশ্য আমাদের সময়ের টুথপেষ্টের মতো নয়। তারা টুথপেষ্ট তৈরিতে ব্যবহার করতো ডিমের পোড়া খোসার ছাই। 

মিশরীয়রা বিড়ালকে খুব পছন্দ করতো। প্রাচীন মিশরের মানুষ সবধরনে পশুকে দেব-দেবীর প্রতীক বলে মনে করতো। তবে সব পশুর মধ্যে বিড়ালের একটি আলাদা জায়গা ছিল। তারা বিড়ালকে ভাল ভাগ্যের বাহক বলে মনে করতো। যখনই তাদের পালিত কোন বিড়াল মারা যেত তখন তারা তাদের চোখের ভ্রু সেভ করে ফেলতো। তারা বিড়ালের মমি তৈরি করতো এবং বিড়ালের সাথে ইঁদুর আর এক বাটি দুধে দিয়ে মাটিতে পুঁতে রাখতো।


প্রাচীন মিশরের মানুষ মনোরঞ্জনের জন্য বিভন্ন ধরনে বোর্ড গেম খেলতো। এর মধ্যে সমচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল সিনেট যা কিনা প্রায় ২০০০ বছর ধরে বেশ জনপ্রিয় খেলা ছিল। সিনেট অনেকটা আজকের দিনের লুডুর মতো করে খেলা হতো। 

আশ্চর্যময় প্রাচীন মিশরের কথা
Great Sphinx মূর্তি
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন এবং বৃহৎ মূর্তির মধ্যে অন্যতম “Great Sphinx” প্রাচীন মিশরে তৈরি করা হয়েছিল। যেমনটি উপরের ছবিতে দেখছেন এর মাথা মানুষের মত এবং শরীর সিংহের ন্যায়। মূর্তিটি একটি বড় আকৃতির চুনা পাথর থেকে বানানো হয়েছে। বর্তমানে মূর্তিটির নাকটি ভাঙ্গা অবস্থায় আমরা দেখতে পাই। নাকটি কিভাবে ভাঙ্গলো তা এখনো জান যায় নি। নাকটি চুরি কিংবা ধ্বংসের কারনটি আজ পর্যন্ত এক রহস্য। কিছু প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন যে, যখন সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মিশর আক্রমণ করেছিল তখন তার সৈন্যরা কামান দিয়ে মূর্তিটির নাক ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু এর পক্ষে তারা কোন প্রমান হাজির করতে পারে নি। আবার অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদ ধারনা করেন নাকের মধ্যে মুল্যবাদ কিছু ছিল যা কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু তারাও কোন প্রমান হাজির করতে পারেনি। 

প্রাচীন মিশর এমন একটি সভ্যতা যে সভ্যতা তার সমসাময়িক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। প্রাচীন এই সভ্যতার অজানা কথা, রহস্য যেন শেষ হওয়ার নয়। এই প্রবন্ধে মিশরীয়দের পিরামিড, মমি, ধর্ম বিশ্বাস, স্থাপত্য শিল্প, Great Sphinx, চিকিৎসা বিজ্ঞান, The Great Pyramid of Cholula, Pyramid of Khufu, খেলাধুলা, নারীর অবস্থান, ইত্যাদি বিষয়ে খুবই সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। মিশর নিয়ে ভবিষ্যতের লেখায় প্রত্যেকটা বিষয়ের উপর বিস্তারিত আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ্। বানানগত ভুল কিংবা অন্য কিছু জিজ্ঞাসা থাকলে আমাদের জানাবেন। ভাল থাকবেন। ধন্যবাদ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only

Start typing and press Enter to search