শনিবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৭

ইতিহাসের মহান বিজ্ঞানীদের বিখ্যাত কিছু প্রতারণা

ইতিহাসের মহান বিজ্ঞানীদের বিখ্যাত কিছু প্রতারণা
ইতিহাসের মহান বিজ্ঞানীদের বিখ্যাত কিছু প্রতারণা
চুরি করা পাপ, ঠিক না? কিন্তু চুরিটা যদি করে কোন বিখ্যাত ব্যক্তি যাকে কিনা আবার আমরা আদর্শ বলে মানি, তাহলে? আমাদের সময়ের বিখ্যাত কিছু আবিষ্কার, যা কিনা বদলে দিয়েছে পুরো মানব জাতির ভাগ্য, সেটা যদি হয় কারো কাছ থেকে চুরি করা, তবে কেমন হবে ব্যাপারটা। কথা না বাড়িয়ে চলুন জানি কে কে এই পাপের ভাগিদার। 

গ্যালিলিও গ্যালিলি একজন ইতালীয় পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিক, যিনি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সাথে বেশ নিগূঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। তাকে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক এবং এমনকি আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তিনি জন্মগ্রহন করে ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৫৬৪ এবং মৃত্যুবরণ ৮ জানুয়ারি, ১৬৪২। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কার হচ্ছে টেলিস্কোপ বা বাংলায় দূরবীক্ষণ যন্ত্র। এই টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্র আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অন্যতম বড় ভূমিকা রেখেছে। মহান বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনের গতি বিষয়ক বিখ্যাত প্রথম এবং দ্বিতীয় সূত্র, এবং নিকোলাস কোপারনিকাসের মতবাদের পক্ষে প্রমান উপস্থাপন এসবই সম্ভব হয়েছে এই টেলিস্কোপের কারনে। অনেকতো প্রশংসা হলো, এখন যদি বলি এই টেলিস্কোপের প্রকৃত আবিষ্কারক গ্যালিলিও নয়! তাহলে? ইতিহাসটা বলি শুনুন- গ্যালিলিও তার টেলিস্কোর তৈরির বেশ আগেই ১৬০৮ সালে নেদারল্যান্ডের বিজ্ঞানী Hans Lippershey যিনি Johann Lippershey নামেও পরিচিত প্রথম টেলিস্কোপে আবিষ্কার করেন। কিন্তু তিনি কখনও এর পেটেন্ট নেয়নি। লোকমুখে টেলিষ্কোপ সর্ম্পকে শুনে গ্যালিলিও ১৬০৯ সালের মধ্যে নিজের দেশ ইতিলিতে টেলিস্কোপ তৈরি করে ফেলেছিলেন। গ্যালিলিওর টেলিস্কোপের ধারনা, মডেল ইত্যাদি Hans Lippershey টেলিস্কোপের প্রায় হুবহু ছিল। বর্তমানে সারা পৃথিবীর স্কুলের বইতে টেলিস্কোপের আবিষ্কারক হিসেবে গ্যালিলিওর নাম লেখা হয়, Johann Lippershey নাম একবারও উচ্চারন করা হয় না। কিন্তু টেলিস্কোপের প্রথম আবিস্কারক কিন্তু Lipperhey -ই ছিলেন। ব্যাপারটা অনেকটা “মৎসান্যায়” -এর মত, মানে বড় মাছ কর্তৃক ছোট মাছ ভক্ষণ করা আরকি।


বৈদ্যুতিক বাতি কথা বললে সর্বপ্রথম যে নামটি আপনার মাথায় আসবে সে হচ্ছে, টমাস আলভা এডিসন। এই মার্কিন বিজ্ঞানীর নামে প্রায় ১০৯৩ মত পেটেন্ট আছে। ধারনা করতেই পারছেন কত জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তিনি। বৈদ্যুতিক বাতি ছাড়া তার অন্যতম আবিষ্কার গ্রামোফোন, ভিডিও ক্যামেরা ইত্যাদি। যাই হোক এই মহাজ্ঞানী বিজ্ঞানীর সব আবিষ্কার যে বির্তকমুক্ত তেমনটি নয় কিন্তু। বর্তমানে তাঁর বেশ কিছু আবিষ্কার এবং কর্মকান্ড বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছে। এডিসন এবং Nikola Tesla নামের একজন বিজ্ঞানী একই সাথে কাজ করতেন। অভিযোগ করা হয় এডিসন Nikola Tesla এর অনেক আবিষ্কার নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক হিসেবে তিন সর্বজনের কাছে পরিচিত। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, এডিসনের বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কারের আগে ১৮৬৮ সালে Henry Goebel নামের একজন বিজ্ঞানী প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেন। কথিত আছে Henry Goebel তাঁর আবিষ্কার এডিসনের কাছে বিক্রি করতে গিয়েছেলেন, কিন্তু এডিসনের কাছে আবিষ্কারটি তেমন গুরুত্বপূর্ন মনে হয় নি। পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালে যখন Goebel মারা যায়, এডিসনের ভাবনার পরিবর্তন হয়। এডিসনে Goebel এর স্ত্রীর কাছে থেকে নামমাত্র মূল্যে আক্ষরিক অর্থে অমূল্য আবিষ্কারটি ক্রয় করে নেয় ও কিছুটা পরিবর্তন করে জনসম্মুখে আনে এবং পেটেন্ট করিয়ে নেয়। এডিসন এবং তার সাংবাদিক ভক্ত/বন্ধুরা আবিষ্কারটির ক্রয়ের কথা গোপন রেখে প্রচার করে যে, বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক হচ্ছে এডিসন। আর আমরা তো ভালভাবেই জানি প্রচারেই প্রসার, তার উপর তিনি ইতিহাসের একজন মহান বিজ্ঞানী, তিনি মিথ্যা বলবেন? সুতরাং বেচারা Henry Goebel হয়ে যায় এক অপরিচিত নাম। 

আমারা সবাই জানি টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। গ্রাহাম বেল ১৮৭৬ সালে প্রথম টেলিফোনে পেটেন্ট নিয়েছিলেন। কিন্তু ২০০২ সালে মার্কিন কংগ্রেস এটা স্বীকার করে নেয় যে, ইতালীয় বিজ্ঞানী Antonio Meucci -ই হচ্ছে টেলিফোনের প্রকৃত আবিষ্কারক। বেলেও বহু আগে Antonio Meucci নিউইয়র্ক শহরের একটি ইতালীয়-মার্কিন পত্রিকার সাংবাদিকদের তাঁর আবিষ্কার দেখিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় ১৮৭২ সালে Antonio Meucci তাঁর আবিষ্কার ওয়ের্স্টান ইউনিয়ন টেলিগ্রাফ কোম্পানীর কাছেও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তারা Muecci এর আবিষ্কারের উপর কোন গুরুত্বই দেয় নি। দুই বছর অপেক্ষা করার পর ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের কাছে থেকে কোন সাড়া না পেয়ে Muecci তার পেটেন্ট ফের চায়। কিন্তু তারা Muecci এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে যে, তারা তাঁর সব কাগজপত্র হারিয়ে ফেলেছে। ঠিক এই সময়ই আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোনের পেটেন্ট পাওয়ার জন্য আবেদন করে এবং ঐ ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের সাথেই একসঙ্গে টেলিফোন আবিষ্কারে লেগে পরে। দিশেহারা Antonio Meucci আদালতের আশ্রয় নেয় এবং বেলেও উপর পেটেন্ট চুরির মামলা করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মামলা চলাকালীন সময়ে তিনি মারা যান। টেলিফোন প্রযুক্তি আজ আমাদের বিশ্বকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে। কিন্তু Antonio Meucci তাঁর অন্তিম সময় দারিদ্রতা আর কষ্টে অতিবাহিত করে মারা গেছেন। ২০০২ সালে মার্কিন কংগ্রেস যদিও তাঁর কাজের স্বীকৃতি দেয় তবুও অধিকাংশ দেশই গ্রাহাম বেলের যায়গায় Antonio Meucci এর নাম বসাতে রাজি নয়। তারা টেলিফোন আবিষ্কারের মিথ্যা ইতিহাসকেই বেছে নিয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বড় হচ্ছে ভুল ইতিহাস অধ্যয়ন করে।


রেডিও এমন একটি আবিষ্কার যে, যাকে নিয়ে এখনও বির্তক চলে সমানতালে। রেডিও উদ্ভাবক হিসেবে পৃথিবী জুড়ে যার নাম উচ্চারিত হয় তিনি হচ্ছেন, একজন ইতালীয় উদ্ভাবক, প্রকৌশলী Guglielmo Marconi। রেডিও সম্প্রচার আবিষ্কার করার জন্য তাকে ১৯০৯ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরষ্কার দেওয়ায় হয়। কিন্তু আসলেই কি বেতার সম্প্রচার পদ্ধতি তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন? উত্তরটা হবে, না! রেডিও সম্প্রচার পদ্ধতি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন একজন বাঙ্গালী বিজ্ঞানী যার নাম, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। তিনি Guglielmo Marconi এর অনেক আগে ১৮৭৯ সালে রেডিও তরঙ্গ নিয়ে গবেষনা করেন এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের ল্যাবরেটরিতে রিডিও তরঙ্গ আবিষ্কার করেন। ১৮৯৩ সালে Nikola Tesla নামের একজন বিজ্ঞানী জনগনের সামনে এটি প্রদর্শনও করেছিলেন। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৯৪ সালে কলকাতার টাউন হলে এর প্রদর্শন করিয়েছিলেন। বৈষয়িক বিষয়ে আকর্ষণ ছিল না বিধায়, জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর এই আবিষ্কারের পেটেন্টে জন্য আবেদন করেন নি। ১৮৯৬ সালে লন্ডনে জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথে দেখা হয় Guglielmo Marconi ‘এর। Marconi ‘ও একই বিষয়ের উপর গবেষণা করছিলেন। সেখানে তারা একে অপরের গবেষণার ফলাফল নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন। ১৮৯৭ সালে Marconi বেতার তরঙ্গের বানিজ্যিক ব্যবহার শুরু করেন। ফলে তার নাম ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, জগদীশ চন্দ্র বসু বেতার তরঙ্গ সম্প্রচারের বানিজ্যিক ব্যবহারের বিপক্ষে ছিলেন। পরে যখন Marconi নোবেল পুরষ্কার পান তখন সবাই জগদীশ চন্দ্র বসুর বদলে Marconi ‘কেই রেডিও’র আবিষ্কারক হিসেবে ধরে নেয়। ১৯৫৪ সালে Pearson এবং Brattain নামের দুইজন বিজ্ঞানী জোড়ালোভাবে দাবী করে যে, রেডিও’র প্রকৃত আবিষ্কারক হচ্ছে, জগদীশ চন্দ্র বসু। এবং তারা এর পক্ষে দালিলিক প্রমান হাজির করেন। এরপর থেকে ধিরে ধিরে বিশ্বের কাছে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু পরিচিত হতে থাকেন। জনাব বসু বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহে জন্ম গ্রহন করেন নভেম্বর ৩০, ১৮৫৮ সালে এবং মৃত্যু বরণ করেন নভেম্বর ২৩, ১৯৩৭ সালে। আইনস্টাইন এই মহান বাঙ্গালী বিজ্ঞানী সম্পর্কে বলেছেন, “জগদীশ চন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত”। 

গর্বের রেশ রেখেই আজ শেষ করি। ধন্যবাদ!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Whatsapp Button works on Mobile Device only

Start typing and press Enter to search